হোমরাজ্য

সুহরাওয়ার্দী এভিনিউ এখন 'গোপাল মুখার্জী রোড': কলকাতার এক ঐতিহাসিক নামকরণের নেপথ্য কাহিনী

Saroop Chattopadhay
২১ জুন, ২০২৬
সুহরাওয়ার্দী এভিনিউ এখন 'গোপাল মুখার্জী রোড': কলকাতার এক ঐতিহাসিক নামকরণের নেপথ্য কাহিনী

কলকাতা, ২১শে জুন ২০২৬: কলকাতা শহরের বুকে ঘটে গেল এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (KMC) এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে যে, কলকাতার সুপরিচিত 'সুহরাওয়ার্দী এভিনিউ' (Suhrawardy Avenue)-এর নাম পরিবর্তন করে এখন থেকে 'গোপাল মুখার্জী রোড' (Gopal Mukherjee Road) রাখা হয়েছে। ২০শে জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবসের বিশেষ মুহূর্তে এই সিদ্ধান্তটি সামনে আসে।

এই নামকরণের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং জনমানসে কলকাতার এক বিস্মৃতপ্রায় ঐতিহাসিক চরিত্র এবং ১৯৪৬ সালের 'গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং' (The Great Calcutta Killing)-এর দিনগুলিতে তাঁর ভূমিকার কথা নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। আসুন জেনে নেওয়া যাক কে ছিলেন এই গোপাল মুখার্জী এবং কেন এই নামকরণকে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কে ছিলেন গোপাল মুখার্জী ওরফে 'গোপাল পাঁঠা'?

গোপাল চন্দ্র মুখার্জী, যিনি কলকাতার মানুষের কাছে 'গোপাল পাঁঠা' নামেও পরিচিত ছিলেন, তিনি ছিলেন উত্তর কলকাতার এক বিশিষ্ট ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। কলেজ স্ট্রিট এলাকায় তাঁর পারিবারিক একটি মাংসের ব্যবসা ছিল, যা থেকে তাঁর এই নামকরণ। তবে কেবল ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, সমকালীন সমাজসেবা এবং বিশেষ করে ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গার সময় সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত চর্চিত। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এবং ঋষি অরবিন্দর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও (বিশেষত ৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে) সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

১৯৪৬ সালের 'গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং' এবং কলকাতার রক্ষা

১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট অবিভক্ত বাংলার ইতিহাসে এক কালো দিন। মুসলিম লীগের তৎকালীন 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' (Direct Action Day) বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের আহ্বানের পর কলকাতায় এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, যা ইতিহাসে 'The Great Calcutta Killing' নামে পরিচিত। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দীর প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে সাধারণ নাগরিকদের ওপর অভূতপূর্ব নির্যাতন ও সহিংসতা শুরু হয়।

এই চরম সংকটের সময়ে কলকাতার সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষায় এগিয়ে আসেন গোপাল মুখার্জী। তিনি এবং তাঁর অনুগামীরা মিলে একটি প্রতিরক্ষামূলক বাহিনী গড়ে তোলেন। ইতিহাসের বিভিন্ন নথি অনুযায়ী, গোপাল মুখার্জীর কঠোর নির্দেশ ছিল যে কোনো নিরপরাধ বা নিরস্ত্র মানুষের ওপর যেন কোনো রকম আঘাত না করা হয় এবং নারী ও শিশুদের যেন সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া হয়। তাঁর এই অকুতোভয় প্রতিরোধের ফলেই কলকাতার একটি বড় অংশ এবং বহু মানুষের প্রাণ সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিল।

এমনকি প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, দাঙ্গার পর মহাত্মা গান্ধী যখন কলকাতায় এসে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবাইকে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানান, তখন গোপাল মুখার্জী সাধারণ মানুষের সুরক্ষার স্বার্থে অস্ত্র জমা দিতে অসম্মতি প্রকাশ করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিরক্ষার অধিকার ত্যাগ করা সম্ভব নয়।

সুহরাওয়ার্দী এভিনিউ থেকে গোপাল মুখার্জী রোড: ইতিহাসের সংশোধন

দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার পার্ক সার্কাস সংলগ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নাম ছিল সুহরাওয়ার্দী এভিনিউ, যা ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার সময়ের বিতর্কিত মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দীর স্মরণে নামকরণ করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মতে, কলকাতার বুকে এমন এক ব্যক্তির নাম থাকা অনুচিত ছিল যাঁর আমল বিভাজন ও রক্তক্ষয়ের ইতিহাসের সাথে যুক্ত।

সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই নামকরণের পরিবর্তনকে অনেকেই ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন হিসেবে দেখছেন। সাধারণ নাগরিকদের মতে, এটি কেবল একটি রাস্তার নাম বদল নয়, বরং কলকাতার কঠিনতম সময়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শহরকে রক্ষা করা প্রকৃত বীরদের যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন।

এই খবরটি শেয়ার করুন

আপনার বন্ধুদের সাথে সত্য খবর ছড়িয়ে দিন

#Gopal Mukherjee Road#Suhrawardy Avenue#Kolkata Municipal Corporation#Gopal Patha#Great Calcutta Killing 1946#Kolkata Street Renaming