শ্রীরামকৃষ্ণের রামলালা ও বাংলার রামায়ণ সংস্কৃতি: এক অনন্যালাপ

ভূমিকা বাঙালি সংস্কৃতি ও সনাতন আধ্যাত্মিকতার আকাশে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। কিন্তু বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ যখন রামচন্দ্র ও রামায়ণ সংস্কৃতিকে বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য নয় বলে দাবি করেন, তখন ইতিহাসের পাতা ও শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন আলেখ্য পুনর্পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। লেনিন বা চে গুয়েভারার মতো বিদেশি ভাবাদর্শকে যাঁরা সহজেই আপন করে নেন, তাঁদের বাংলার নিজস্ব মাটির সুগভীর রাম-ভক্তির ইতিহাসকে নতুন করে চেনা প্রয়োজন। রামকৃষ্ণ মিশনের মতো পবিত্র প্রতিষ্ঠানের আদর্শ এবং বাংলার আধ্যাত্মিক চেতনার মেলবন্ধনকে কোনো সংকীর্ণ চশমায় বিচার করা চলে না।
শ্রীরামকৃষ্ণের কুলদেবতা এবং অলৌকিক কবচের ইতিহাস
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের বংশানুক্রমিক কুলদেবতা ছিলেন স্বয়ং রঘুবীর বা রামচন্দ্র। ঠাকুরের আধ্যাত্মিক জীবনের এক পরম সুরক্ষাকবচ ছিল তাঁর শরীরে ধারণ করা পবিত্র দেব-কবচ। শ্রীরামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণের পর এই আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন শ্রীশ্রী মা সারদা দেবী। এই কবচকে কেন্দ্র করে শ্রীমাকে অলৌকিক উপায়ে ঠাকুর সতর্ক করেছিলেন, যা মা সারদা সারাজীবন পরম যত্নে স্মরণে রেখেছিলেন।
দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে আত্মভাবে মা ভবতারিণীর দর্শন লাভের পর, শ্রীরামকৃষ্ণের মনে তীব্র ব্যাকুলতা জেগেছিল কুলদেবতা রঘুবীর রামচন্দ্রকে চাক্ষুষ করার। তাঁর সেই সাধ অপূর্ণ থাকেনি। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে দর্শন করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র, লক্ষণ এবং সীতাদেবীর চরণে প্রণামরত পরম ভক্ত হনুমানকে।
জটাধারী, রামলালা এবং দক্ষিণেশ্বরের লীলা
শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল রামায়েৎ বৈষ্ণব সাধক জটাধারীর আগমন। তাঁর সান্নিধ্যেই ঠাকুর রামচন্দ্রের শিশুমূর্তি বা ‘রামলালা’র পূজা ও সেবাধর্মে দীক্ষিত হন। জটাধারী, শ্রীরামকৃষ্ণ এবং বালক রামলালার সেই অপার্থিব লীলাবৈচিত্র্যে একসময় মুখরিত হয়ে উঠেছিল দক্ষিণেশ্বর প্রাঙ্গণ।
প্রাজ্ঞ বৈষ্ণব গুরু জটাধারী উপলব্ধি করেছিলেন যে, রামলালার সার্থক আশ্রয় একমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণের হৃদয়েই সম্ভব। কারণ, যাঁর কুলদেবতা স্বয়ং রঘুবীর, তাঁর চেয়ে বড় আধার আর কে হতে পারে? ফলস্বরূপ, গুরুপরম্পরায় সেই পবিত্র রামলালার বিগ্রহ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছেই থেকে যায়।
বাঙালি সংস্কৃতি ও কৃত্তিবাসী রামায়ণ
শৈশব থেকেই শ্রীরামকৃষ্ণ রামচন্দ্রের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন রামায়ণের এক অনন্য ভাষ্যকার। বাঙালির ঘরে ঘরে ‘কথামৃত’ আজ এক পরম পাথেয়, যেখানে রামকথার বহু অমূল্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। শ্রীরামকৃষ্ণের মতো করে রামচন্দ্র ও রামায়ণকে খুব কম বাঙালিই অনুধাবন করতে পেরেছেন।
আমাদের এই বঙ্গদেশ আসলে কৃত্তিবাসী রামায়ণের দেশ। এ দেশের মানুষ এখনও সীতাদেবীর দুঃখে অশ্রুপাত করে, এ দেশের ঘরে ঘরে তুলসী মঞ্চে রামায়ণ পাঠের ঐতিহ্য শতাব্দীর প্রাচীন। তাই বাংলায় রামচন্দ্রের প্রাচীনত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা একেবারেই অবান্তর।
উপসংহার
রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভেদ বা সংকীর্ণ বিতর্ক দূরে সরিয়ে রেখে আমাদের সত্যকে গ্রহণ করতে হবে। শ্রীরামকৃষ্ণের রাম ও রামায়ণ চর্চার ভূমি এই পবিত্র বঙ্গদেশ। বাংলার মাটি যুগে যুগে সর্বধর্মসমন্বয় এবং আধ্যাত্মিকতার আলোয় আলোকিত হয়েছে। সমস্ত নেতিবাচক মানসিকতা দূর হোক, এবং রামকৃষ্ণের চরণের স্পর্শে ধন্য এই বাংলায় আধ্যাত্মিকতার আলো পুনরুত্থিত হোক।
শুভ হোক। শুভ হোক। শুভ হোক।
