বাম আমলে মনীষা মুখোপাধ্যায় নিখোঁজ রহস্যের আজানা কাহিনী

১৯৯৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সহকারী পরীক্ষা নিয়ামক মনীষা মুখোপাধ্যায় সকালে ভবানীপুরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটি ট্যাক্সিতে ওঠেন।
তারপর?
যেন কর্পূরের মতো উবে গেলেন তিনি। কোনো দেহ নেই, কোনো নিশ্চিত গন্তব্য নেই, কোনো নির্ভরযোগ্য শেষ ঠিকানা নেই।
শুধু রয়ে
গেল কিছু
প্রশ্ন, কিছু
বিচ্ছিন্ন সূত্র
এবং এমন
কিছু প্রভাবশালী
নাম—যাদের
চারপাশে তৎকালীন
বাংলার ক্ষমতার
রাজনীতি আবর্তিত
হতো।
প্রায় তিন
দশক পরেও
সেই প্রশ্নগুলোর
সম্পূর্ণ উত্তর
মেলেনি।এটা কি
নিছক স্বেচ্ছায়
অন্তর্ধান? নাকি
এমন কোনো
নিষিদ্ধ সম্পর্ক, ক্ষমতার
সমীকরণ কিংবা
গোপন কেলেঙ্কারির
ফল, যার
দরজা একবার
বন্ধ হয়ে
গেলে ভিতরের
সত্য আর
বাইরে আসেনা?
মনীষা মুখোপাধ্যায়
ছিলেন তৎকালীন
শাসকদল সিপিআইএম-এর
সক্রিয় সদস্যা।
তাঁর পরিবারের
সঙ্গে রাজনৈতিক
মহলের যোগাযোগও
ছিল বলে
দাবি করা
হয়। তাঁর
মায়ের কাছে
থাকা কিছু
ফোটোগ্রাফে তৎকালীন
বামফ্রন্টের অঘোষিত
চাণক্য অনিল
বিশ্বাস এবং
শীর্ষ নেতা
বিমান বসুর
উপস্থিতির প্রমাণ
পাওয়া গেছিলো।অর্থাৎ,রাজনৈতিক
যোগাযোগ তাঁর
জীবনে নিছক
পার্টি অফিসের
চার দেওয়ালের
মধ্যে সীমাবদ্ধ
ছিল না,বরং
সেটা তার
বেডরুম পর্যন্ত
বিস্তৃত ছিলো—এমন
একটি ছবি
অন্তত তাঁর
পরিবার ও
পরবর্তী আলোচনায়
পাওয়া যায়।আর
এখানেই গল্পটা
একটু অস্বস্তিকর
হয়ে ওঠে।
কারণ ক্ষমতার
সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
কখনও শুধু
রাজনৈতিক থাকে
না। তার
সঙ্গে জড়িয়ে
থাকে ব্যক্তিগত
গোপন সম্পর্ক, বিশ্বাস, আনুগত্য, সুবিধা, গোপনীয়তা—আর
কখনও এমন
কিছু সমীকরণ, যার
কথা প্রকাশ্যে
বলা যায়
না।মনীষার ক্ষেত্রেও
তেমন কোনো
অপ্রকাশিত সম্পর্ক
ছিল কি
না, তার
নির্ভরযোগ্য উত্তর
আজও নেই।
কিন্তু তাঁর
অন্তর্ধানের পর
সেই প্রশ্ন
উঠেছিল—এটা
অস্বীকার করার
উপায় নেই।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে
আসে আনন্দবাজার
পত্রিকার পাতায়
তাঁর বৃদ্ধা
মা চিনু
মুখোপাধ্যায়ের দেওয়া
নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তির
মাধ্যমে। শিক্ষা
সংক্রান্ত খবরের
দায়িত্বে থাকা
এক সাংবাদিক
বিজ্ঞাপনটি দেখে
মনীষার বাড়িতে
পৌঁছন। তাঁর
মায়ের কাছ
থেকে সংগ্রহ
করেন পুলিশের
কাছে দায়ের
করা নিখোঁজ
ডায়েরির কপি
এবং কয়েকটি
গুরুত্বপূর্ণ ছবি।তারপর
ঘটে আরেক
অদ্ভুত অধ্যায়।পরবর্তীতে
আনন্দবাজার পত্রিকা
অফিসে একটি
বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে
ড্রয়ারে রাখা
সেইসব ছবি
ও নথি
পুড়ে যাওয়ার
দাবি সামনে
আসে।নিয়তির সন্দেহজনক
পরিহাস!
একজন নিখোঁজ
নারী। কিছু
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত
ছবি। রাজনৈতিক
যোগাযোগ। আর
তারপর সেই
ছবিগুলোরই আগুনে
পুড়ে যাওয়া!এটা
নিছক দুর্ভাগ্যের
ঘটনা—নাকি
ইতিহাসের কোনো
নিষ্ঠুর irony?
নিশ্চিতভাবে বলা
যায় না।
মনীষার অন্তর্ধানকে
ঘিরে ধীরে
ধীরে দুটি
আলাদা narrative তৈরি হয়।
একটি narrative-এর
কেন্দ্রে ছিল
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রশাসন, গোপন
নথি এবং
রেজাল্ট সংক্রান্ত
অনিয়ম ও
দুর্নীতির অভিযোগ।
প্রশ্ন উঠেছিল—মনীষা
কি এমন
কিছু জানতেন, যা
প্রকাশ্যে এলে
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের
ক্ষমতার কাঠামো
নড়বড়ে হয়ে
যেতে পারত?
কিন্তু এখানেও
আরেকটি প্রশ্ন
ছিল।
একজন সহকারী
পরীক্ষা নিয়ামক
কি একা
এত বড়
কোনো সিন্ডিকেট
চালাতে পারেন?
সম্ভাবনা কম।
তাহলে তিনি
যদি কোনো
অনিয়ম সম্পর্কে
জানতেন, তাঁর
ভূমিকা ঠিক
কী ছিল—অংশীদার, সাক্ষী, না
কি শুধুই
এমন একজন
ব্যক্তি যিনি
ভুল সময়ে
ভুল কিছু
জেনে ফেলেছিলেন?
উত্তর নেই।
এর সঙ্গে
যুক্ত হয়েছিল
তাঁর ব্যক্তিগত
জীবন। পরিবারের
সঙ্গে মনোমালিন্য, আধ্যাত্মিকতার
দিকে ক্রমশ
ঝুঁকে পড়া
এবং ক্ষমতাবান
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের
সঙ্গে তাঁর
ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ—সব
মিলিয়ে তাঁর
ব্যক্তিগত জগতটিও
ধীরে ধীরে
রহস্যের অংশ
হয়ে ওঠে।
কেউ কেউ
তাঁকে দেখেছেন
রাজনৈতিক যোগাযোগে
থাকা একজন
উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহিলা
হিসেবে। কেউ
দেখেছেন এমন
একজন মানুষ
হিসেবে, যিনি
ব্যক্তিগত এবং
রাজনৈতিক জীবনের
জটিল সমীকরণে
আটকে পড়েছিলেন।
কোন ছবিটা
সত্যি?
সম্ভবত আমরা
কখনও জানতে
পারব না।
এরপর কলকাতা
পুলিশের Detective Department
(DD) তদন্তে নামে।
এবং সেখানেই
সামনে আসে
আরও অদ্ভুত
সূত্র।নিখোঁজ হওয়ার
পর পুরুলিয়ার
অযোধ্যা পাহাড়ের
একটি মন্দির/আশ্রম
এলাকায় মনীষাকে
দেখা গিয়েছিল—এমন
lead
তদন্তকারীদের হাতে
আসে। তাঁর
সঙ্গে গোপাল
মুখোপাধ্যায় নামে
এক ব্যক্তির
যোগাযোগের কথাও
সামনে আসে।
কিন্তু সেই
সূত্রের পর?
অন্ধকার।
আর কোনো
নিশ্চিত trace নেই।
কোনো নির্ভরযোগ্য
chain
of evidence নেই। মনীষা
সত্যিই সেখানে
গিয়েছিলেন কি
না, গেলে
কেন গিয়েছিলেন, তারপর
কোথায় গেলেন—কোনোটারই
definitive
উত্তর নেই।
তদন্তের আরেক
পর্যায়ে তাঁর
সম্ভাব্য উপস্থিতির
সূত্র পাওয়া
যায় বোধগয়া, ঢাকা
এবং অসমের
কামাখ্যা পর্যন্ত।
পুলিশ এমন
দাবিও করেছিল
যে তাঁকে
কামাখ্যায় সন্ন্যাসিনীর
পোশাকে দেখা
গিয়েছিল।
একজন বিশ্ববিদ্যালয়কর্মী
হঠাৎ সন্ন্যাসিনী?
ভুল identification?
নাকি বিবেকের
দংশনে নিজের
পুরোনো পরিচয়
মুছে ফেলার
চেষ্টা?
নাকি তদন্তের
গতি ঘোরানোর
জন্য ভুল
ইনফরমেশন?প্রতিটি
সম্ভাবনাই রহস্য
কে আরও
অন্ধকার করে
তোলে।
আর তখনই
আসে সবচেয়ে
uncomfortable
প্রশ্নটি।
মনীষা কি সত্যিই নিখোঁজ হয়েছিলেন, নাকি তিনি নিজেই নিজের পুরোনো জীবন থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন?
যদি স্বেচ্ছায় চলে গিয়ে থাকেন—তাহলে এতগুলো বিচ্ছিন্ন সূত্র কেন?
আর যদি তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে—তাহলে দেহ কোথায়?
কার স্বার্থে?
কেন?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কারা জানত, কিন্তু মুখ খোলেনি?
কোনও একজন তৎকালীন শাসকদলের নেতা যিনি মনীষার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি নাকি মনীষার মাকে বলছিলেন “এতো বড় শহরে কেউ যদি নিজেই হারিয়ে যায় তাঁকে খোজা অসম্ভব!”মেয়ের সন্ধানে বৃদ্ধা মা পুলিশের দরজা থেকে প্রশাসনের দরজা, এমনকি রাইটার্স বিল্ডিং পর্যন্ত ঘুরেছেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর কথিত মন্তব্য—“এমন ঘটনা তো ঘটেই থাকে”—পরবর্তী সময়ে এই কাহিনির অন্যতম আলোচিত অংশ হয়ে ওঠে।
যদি মন্তব্যটি
সত্যিই সেই
প্রেক্ষাপটে করা
হয়ে থাকে, তাহলে
সেটি নিছক
একটি রাজনৈতিক
মন্তব্য ছিল, নাকি
একটি বৃহত্তর
প্রশাসনিক উদাসীনতার
প্রতীক—সেটাও
আজ প্রশ্নের
বিষয়। কারণ একটি
মানুষ হারিয়ে
গেলে শুধু
মানুষটি হারায়
না।
হারিয়ে যায়
তাঁর স্মৃতি, সম্পর্ক, নথি, ব্যক্তিগত
ইতিহাস এবং
তাঁর জানা
তথ্যের সম্ভাব্য
মূল্য।মনীষার ক্ষেত্রেও
সেই হারিয়ে
যাওয়া জিনিসগুলোর
তালিকা ক্রমশ
দীর্ঘ হয়েছে।
একজন নারী
উধাও হলেন।
তার সঙ্গে
জড়িয়ে রইল
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন।
রাজনৈতিক ক্ষমতা।
ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার
গুঞ্জন।
সম্ভাব্য দুর্নীতি।
আধ্যাত্মিকতার দিকে
তাঁর ঝোঁক।
অদ্ভুত সব
সাক্ষ্য।
পুরুলিয়া থেকে
কামাখ্যা পর্যন্ত
ছড়িয়ে থাকা
বিচ্ছিন্ন সূত্র।
আর এমন
কিছু নথি
ও ছবি, যেগুলোর
অস্তিত্ব নিয়েও
আজ প্রশ্নের
অবকাশ রয়েছে।
তাহলে শেষ
পর্যন্ত সত্যিটা
কী?
মনীষা কি
নিজের ইচ্ছায়
পুরোনো জীবনকে
পিছনে ফেলে
অদৃশ্য হয়ে
গিয়েছিলেন?
নাকি তিনি
এমন কোনো
ক্ষমতার নিষিদ্ধ
দরজার সামনে
পৌঁছে গিয়েছিলেন, যার
ওপারে ছিল
এমন এক
সত্য—যেটা
প্রকাশ্যে আসা
কারও জন্যই
সুবিধাজনক ছিল
না?
রাজনৈতিক চক্রান্ত?
ব্যক্তিগত সম্পর্কের
জট?
বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি?
নাকি একেবারেই
অন্য কোনো
গল্প?
প্রমাণের অভাবে
আজও কোনো
একটি উত্তরকে
চূড়ান্ত সত্য
বলা যায়
না।
কিন্তু প্রায়
তিন দশক
পরেও যদি
একজন মানুষকে
নিয়ে প্রশ্ন
থেকে যায়—তিনি
কোথায় গেলেন, কেন
গেলেন এবং
তাঁর অন্তর্ধানের
আগে তিনি
ঠিক কী
জানতেন—তাহলে
সেই রহস্যকে
শুধু “একজন
মহিলা নিখোঁজ
হয়েছিলেন” বলে
পাশ কাটিয়ে
যাওয়া যায়
না।
সত্যিটা হয়তো
কোনোদিন প্রকাশ্যে
আসবে। অথবা
হয়তো সেই
সত্যও সেইসব
হারিয়ে যাওয়া
ছবির মতোই—কোনো
এক অন্ধকার
ড্রয়ারে, আগুনের
ছাইয়ের নিচে, চিরতরে
চাপা পড়ে
গেছে।
(লেখায়
যে সাংবাদিকের
কথা বারবার
উঠে এসেছে, তিনি
হলেন আনন্দবাজারের
এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট
কভার করা
সাংবাদিক রোহিত
বসু।)
